মুর্শিদা এনাম মীমের ''মা দিবস প্রতিদিন''

মুর্শিদা এনাম মীমের ''মা দিবস প্রতিদিন''

আমার কাছে মা দিবস প্রতিদিন। অসংজ্ঞায়ীত একটি শব্দ হলো মা।মায়েদের বয়সের সীমানা থাকেনা। মা কথাটিতে ধনী গরীবের কোন বৈষম্য থাকে না। যে নামেই ডাকা হোকনা কেনো, মায়েরা দিন শেষে মা-ই। বয়স, পরিচয়, স্বার্থ সবকিছুকে তুচ্ছ করে মাতৃত্বকে সার্বজনীন করে তুলতে পারে কেবল মায়েরাই।

আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় একজন পুরুষের ক্ষেত্রে অতটা না হলেও একজন মেয়েকে জীবনের পুরো সময়টাকে ভাগ করতে হয় দুজন মায়ের জন্য। এক মা পেটে ধারণ করে নাড়ি ছিড়ে এই পৃথিবীতে নিয়ে এসে মমতার চাদরে মুড়িয়ে রেখে বড় করে।আর এক মা (শাশুড়ী) তার ছেলের বউ করে নিয়ে বাকিটা জীবন তার কাছে রেখে দেয়। হিসেবের পাল্লায় লাভবান হয় পরে যে মাকে (শাশুড়ি) আমরা পাই।আবার যদি বউমা হয়ে আসা মানুষটি শুধু বউ এর মধ্যে নিজেকে আটকে রাখে মেয়ে হয়ে শাশুড়ীর পাশে না থাকে তাহলেই রচনা হয় নানান বেদনাদায়ক নির্মমতার গল্প।

এদিক থেকে আমি খুব ভাগ্যবতী। কারণ আমি আমার মায়ের (শাশুড়ীর)মেয়ে হতে পেরেছি।যদিও শাশুড়ীর মেয়ে হওয়া বড্ড সাধনার ধন।এ বড় কঠিন কাজ।তবে সাধনায় কোন গাফলতি না থাকলে সিদ্ধি লাভ সম্ভব।
যাইহোক আমার গল্পে আসা যাক।

মায়ের বয়স আশি বছর পার হলো।এগারোজন গ্রাজুয়েট সন্তানের জননী। এখন পর্যন্ত একা যা পারে আমরা ছয় জন বৌমা মিলেও সেই কাজ পারি না।পরে বুঝি মা বলেই এতোকিছু সম্ভব।ছেলে ছেলের বউ আর মেয়ে মেয়ের জামাই নাতি নাতনি মিলে মোট ৬১জনের রাজপ্রাসাদের রানী মা।আমি যে মেয়ে কি করে বুঝলাম?তাহলে বলি!আমি সবার ছোট ছেলের বউ।প্রথমত আমাকে না বকলে মার ভালো লাগে না।কাছে কিংবা দূরে যেখানেই থাকিনা কেন আমাকে তার বকতেই হবে।যেমন আমি (ব্যাডানগিরি কেন করি)পুরুষের মত ঘর বাহির সব সামলাই কেন?ঘরে থাকি না কেন?এতো সাহস দেখাই কেন?ইত্যাদি। কিন্তু আমি জানি এই বকায় যে কি শান্তি তা যে না পেয়েছে সে বুঝবে না।এগুলো বকা না আমার কাছে দোয়া

এতজনের ভীড়েও মায়ের যত গোপন কথা সব আমার সাথে। কোথায় কি লাগবে? কাকে কি দিতে হবে?যত চাওয়া পাওয়া সব আমার কাছে।আবার বকা দিয়ে বাড়ির যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে হলে মায়ের কথা মীম রে জিগা!ও কি বলে দেখ!সব কিছুতে মীমকে তার চাই।

আবার আমার হাতের রান্না হলে নাকি সে পেট ভরে খেতে পারে।আর আমার হাতের যেকোনো পাকোড়া এক পিচ হলেই ব্যাস আর কোন তরকারি লাগে না।তাই আমিও যতদিন আমার কাছে থাকে ততদিন তো সমস্যা নেই।আর যখন না থাকে সেই কয়দিনের পাকোড়ার বক্স রেডি করে দেই। পরে শুধু মা গরম করে খায়।আর একসাথে অনেক দিনের মায়ের পছন্দের রান্না তরকারি বাটা মশলা সব বক্স করে করে গুছিয়ে দিয়ে আসি যাতে করে মার কোন সমস্যা না হয়।এতো বয়স হয়েছে তবুও যখন সাবান মেখে একদিন পর একদিন গোসল করাতে যাই তখন বেশি চেচামেচি করে।তার নাকি সরম লাগে।তবুও জোর করে করি।

মায়ের পান মশলাটা সব সময় রিজার্ভ রাখি বলে আমি নাকি বেহিসাবি। আর ভিটামিন ঔষধ খাওয়াতে হয় বেশি কষ্ট।খেতে চায় না মুখ চেপে ধরে বাচ্চাদের মতো খাওয়াতে হয়। মায়ের ছেলেমেয়েরা কিছু জানতে চাইলে বলে না কিছু লাগবে না আমার। কিন্তু আমি জানতে চাইলে এক এক করে সব বলবে।বাড়ির কাজের লোকের প্রয়োজন থেকে শুরু করে মেয়ে জামাইর প্রয়োজন পর্যন্ত।অন্য সব বৌমাদের মা তুমি করে বলে। আর আমাকে নাম ধরে তুই করে বলে।আমিও মা তুমি বলে ডাকি। মজার ব্যপার হলো পরিবারের অন্য সদস্যরা মাকে লেগপুল করে বলে মীমই তো তোমার একমাত্র আদরের বউ।আমার কি মজা লাগে তখন তা বলে বোঝাতে পারবো না। মুচকি মুচকি হাসে মা তখন।আর বলবেই না কেন।আমি মাঝে মাঝে শপিং মলে এমনিতে ঘুরতে নিয়ে যাই।মায়ের পছন্দমত কেনাকাটা করার জন্য। মা নিজের জন্য না কিনে ঘুরে ঘুরে শাড়ি পছন্দ করবে আর বলবে এই রং ডা তোরে খুব ভালো দাখাইবো।যেমন উপরের ছবির শাড়ি টি মায়ের পছন্দের। আমি আগেই চুপিচুপি মায়ের ব্যাগে টাকা রেখে দেই।যখন আমার জন্য কিনে তখন বিলটাও মাকে দিয়ে দেওয়াই।মা খুব আনন্দ পায়।

এই আনন্দ তৃপ্তির,এই হাসি মাতৃত্বের পূর্নতার,এই হাসি নির্ভরতার,আস্থার, বিশ্বাসের শান্তির, স্বস্তির।
এই যে মায়ের মুখের হাসি ফোটানো সাধনা করি আমি এটা মায়ের জন্য না।আমি করি আমার নিজের জন্য। কারন আমি বড্ড স্বার্থপর ভালাবাসার ক্ষেত্রে। আমি বিশ্বাস করি আজ আমি যা করবো কাল আমার সাথে তাই হবে।কর্ম কখনো ফাঁকি দিবে না।আর প্রকৃিতির কাছে মানুষ বরাবরই খুব অসহায়।প্রকৃতির বিচার খুব নিখুঁত।যার প্রমান করোনা ভাইরাস।

জানি অনেকেই বলবেন নিজের সাফাই নিজেই গাইলেন।হ্যাঁ আজ কিছুটা নিজেই গাইলাম। কারণ আমাদের মা মেয়ের জীবন কাহিনী থেকে একজন ছেলের বউ ও যদি বউমা থেকে শাশুড়ীর মেয়ে হয়ে ওঠে তাই হবে আমার স্বার্থকতা। বন্ধ হয়ে যাবে বৃদ্ধাশ্রমের দুয়ার।

ভালবাসায় মোড়ানো থাকুক সকল শাশুড়ি বউ এর সম্পর্ক, ভালো থাকুক সকল মা।

~~মুর্শিদা এনাম মীম
murshidamim89@gmail.com                                                   

0/Post a Comment/Comments

অপেক্ষাকৃত নতুন পুরনো