ইমামুলের ছোটগল্প ''দু'টি ট্রাক'' ধারাবাহিক-২

ইমামুলের ছোটগল্প ''দু'টি ট্রাক'' ধারাবাহিক-২

দু'একটা দূর্বাঘাসের চিকন ডগা ছিরে মুখে দিয়ে কুটিকুটি করছি। কিন্তু বেমালুম ভুলে গেলাম তাদের কোমল আতিথিয়েতার সেই মিষ্টি ডাক কথা। ইতোমধ্যে মনে হলো আমরা যেন বসে আছি গ্রাম ও শহরের যোগসূত্র স্থাপনের কোনো এক নতুন মহাসড়কের একেবারে কিনারা ঘেষে।যেখানে বসে শহুরে ও গ্রামীণ জীবনের দ্বৈত মেরুর দ্বৈত অভিজ্ঞতার বাস্তব উপলব্ধি হৃদয় দিয়ে বুঝতে পারলাম। উক্ত মহাসড়ক দিয়ে এ লকডাউনে তেমন কোনো গতিশীল যানবাহনের বাহ্যিক উপস্থিতি মোটেই চোখে পড়লোনা।দূর থেকে শুধু দু'টি চলন্ত ট্রাকের যান্ত্রিক শব্দ আমাদের দু'জনার মনোজাগতিক কেন্দ্রে আঘাত হানে। উক্ত যান্ত্রিক শব্দ আমাদের 'টিকে থাকা, বেঁচে থাকা' নিয়ে দু'জনের আলাপচারিতায় ছন্দোপতন ঘটায়। ট্রাক দু'টিতে দূর থেকে লাল রঙের নিশান প্রতিচ্ছবি আমার মধ্যে একধরনের উৎকন্ঠা তৈরি করছে। আমার সন্দেহের অভিব্যক্তি আরও তীব্রতর হচ্ছে। যতোই ট্রাক দু' টি ক্রমাগত আমাদের সম্মুখে ছুটে আসছে, ততই ট্রাক দু'টোর সামনের লাল কাপড়ের ব্যানারে সাদা অক্ষরে লেখাগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠছে। 'লাশবাহী ট্রাক' লেখাটির সুস্পষ্টতা আমার মস্তিষ্কে বাঁচার অস্পষ্টতাকে আরো তীব্রতর করে। ট্রাক দু'টি কাছাকাছি আসলে দেখলাম, ট্রাক দু'টির পাকস্থলির প্রকোষ্টে সাদা কাফনে শক্তকরে আটকানো অগণিত লাশের স্তূপনিয়ে এগিয়ে আসছে। করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণকারী লাশকে যেভাবে কাফন কাপড় পড়ানো হয় লাশগুলো দেখতে এমন অবিকল। এভাবে ট্রাক দু'টি পরপর আমাদেরকে অতিক্রম করে দ্রুতবেগে সামনের দিকে ছুটে চলল। লাশবাহী ট্রাক দু'টি আমাদের পাশ দিয়ে ছুটে চলার সময়ে লাশের তীব্র দুর্গন্ধ ছড়িয়ে দিয়ে গেল আমাদের পারিপার্শ্বিক প্রতিবেশে। নাকের সূক্ষ্ম গহ্বর দিয়ে লাশের দুর্গন্ধ আমাদের মস্তিষ্কের কেন্দ্র এক বাঁচা-মরার সবুজ সঙ্কেত প্রেরণ করে। আর সাথে সাথে মনে হলো, কোরোনা ভাইরাসটির শক্তিশালী জীবাণু লাশের দুর্গন্ধের সাথে নাকের সূক্ষ্ম ফুটো দিয়ে দেহাভ্যন্তরে ঢুকে পরলো।দু'জনের মধ্যে করোনা জীবাণু প্রবেশ করে দেহ নামক প্রাকৃতিক যন্ত্রটিকে সংক্রমিত করেছে। জীবন্ত করোনা অতি দক্ষভাবে ও সূক্ষ্ম কূটনৈতিক পদ্ধতিতে মানববিধ্বংসী তৎপরতা চালাচ্ছে আমাদের প্রাকৃতিক যন্ত্রে। দু'জনার চলার পথে এই ক্ষুদ্র ভাইরাসের উপদ্রবের উপস্থিতি সব সময় আমাদের মধ্যে মৃত্যুভীতির মরনশীলতার হুল বারবার ফুটাচ্ছে।এই মৃত্যুই আমাদেরকে যাবতীয় সম্পর্কের পাঠ চুকিয়ে নিয়ে যাবে ভিন্ন কোনো অন্ধকার প্রকোষ্টের ছোট্ট গহ্বরে। যেমন লাশবাহী ট্রাক দু'টি অগণিত লাশ নিয়ে দ্রুতবেগে চলে যাচ্ছে জগতের যাবতীয় অনুশাসন ভেঙে কোনো এক এক অনিশ্চিত গন্তব্যে। বুঝা গেল মৃত্যুর মতো অনিবার্যতার কাছে আমরা বড়োই অসহায়। দু'জনার চলার পথ কোথায় গিয়ে যেন আলাদা হবে তাও এই করোনার জীবাণু দৈহিক ও মনোজাগতিক অবয়বে প্রবেশ করিয়ে দিল। আর নীরবে শক্তিশালী হুঙ্কারে জানান দিয়ে গেল পরবর্তী অনিশ্চিত অনিবার্য পথে হাঁটার প্রস্তুতি নিতে। আরও জানান দিয়ে গেল, ট্রাক দু'টি তার উদর খালি করে নতুন লাশ বহনের জন্য আবারো দ্রুতবেগে ফিরে আসছে। তোমরা প্রস্তুত হও, আলাদা হও, সম্পর্কের গভীরতা হালকা করো।একে অপরের চেনা-জানার চিহ্নগুলো মুছে ফেলো মৃত্যুর কালো রঙ দিয়ে। দু'জনের মধ্যে করোনা জীবাণু প্রবেশ করে দেহ নামক প্রাকৃতিক যন্ত্রটিকে সংক্রমিত করছে।
আর সেই জীবন্ত করোনার অতি সূক্ষ্ম জীবাণু মানববিনাশী তৎপরতা চালাচ্ছে। দু'জনার চলার পথে এই ক্ষুদ্র ভাইরাসের উপদ্রবের উপস্থিতি সব সময় আমাদের মধ্যে মৃত্যুভীতির মরনশীলতার হুল বারবার ফুটাচ্ছে। এই মৃত্যুই আমাদেরকে যাবতীয় সম্পর্কের পাঠ চুকিয়ে দিয়ে নিয়ে যাবে ভিন্ন কোনো অন্ধকার প্রকোষ্টের ছোট্ট গহ্বরে। যেমন লাশবাহী ট্রাক দু'টি অগণিত লাশ নিয়ে দ্রুতবেগে চলে যাচ্ছে জগতের যাবতীয় অনুশাসন ভেঙে কোনো এক অনিশ্চিত গন্তব্যে। বুঝা গেল মৃত্যুর মতো অনিবার্যতার কাছে আমরা বড়োই অসহায়। দু'জনার চলার পথ কোথায় গিয়ে যেন আলাদা হবে তাও এই করোনার জীবাণু দৈহিক ও মনোজাগতিক অবয়বে প্রবেশের মাধ্যমে নীরবে শক্তিশালী হুঙ্কারে জানান দিয়ে গেল। আমরা যেন পরবর্তী অনিশ্চিত অনিবার্য পথে আমাদের হাঁটার প্রস্তুতি নিতে পারি।

আরও জানান দিল, ট্রাক দু'টি তার উদর খালি করে নতুন লাশ বহনের জন্য আবারো দ্রুতবেগে ফিরে আসছে। তোমরা প্রস্তুত হও, আলাদা হও, সম্পর্কের গভীরতা হালকা করো। একে অপরের চেনা-জানার চিহ্নগুলো মুছে ফেলো মৃত্যুর কালো রঙ দিয়ে। দু'জনে আলাদা হওয়ার প্রস্তুতি নিলাম। করোনায় সংক্রমিত হওয়ার তথ্য প্রকাশ করে গরীব রাষ্ট্রের চিকিৎসা দ্বারা শুধু শুধু জীবনের ভারি বোঝা বহনের প্রক্রিয়া আরো জটিল হবে ভেবে তথ্য গোপন রাখার ভুল বা সঠিক সিদ্ধান্ত নিলাম। দু'জন আলাদা অনিশ্চিত অনিবার্য পথে হাঁটতে দুটি আলাদা কাঁচা রাস্তা করে মহাসড়কের দিকে অগ্রসর হলাম। মহাসড়কের যেই স্টেশনে ট্রাক দু'টি মহাকালের যাত্রীদের তুলে তার পাকস্থলির ক্ষুধা নিবৃত্ত করে সেই গন্তব্যে হাঁটতে থাকছি। দু'জনে দু'টি আলাদা আলাদা ট্রাকের প্রতিক্ষায়। ট্রাক দু'টি আসবে, অবশ্যই আসবে। ঘুম ভেঙ্গে গেল দুঃস্বপ্নে, বহু মহাজাগতিক জগৎ ঘুরে ফিরে এলাম বাস্তব জগতে।

ভাবতে থাকলাম অনিশ্চিত অনিবার্য না জাগার ঘুম নিয়ে। ভাবলাম, ট্রাক আসবে, অবশ্যই ট্রাক আসবে।"

মোহাম্মদ ইমামুল ইসলাম প্রভাষক, ইংরেজি বিভাগ গ্লোবাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, বরিশাল

0/Post a Comment/Comments

অপেক্ষাকৃত নতুন পুরনো