দেশে জিনোম সিকোয়েন্স এর গবেষণা জরুরী: এ্যাডভোকেট মুহাম্মদ আহসান হাবীব

দেশে জিনোম সিকোয়েন্স এর গবেষণা জরুরী: এ্যাডভোকেট মুহাম্মদ আহসান হাবীব


বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাসের প্রকোপ বেড়েই চলেছে। লাখো মানুষ এখন মৃত্যুঝুঁকিতে রয়েছে। নবাগত এ প্যাথোজেনিক ভাইরাসটি নিয়ত মিউটেট করছে বা রূপ পাল্টাচ্ছে। বাংলাদেশে কোন ধরনের করোনাভাইরাস বিরাজ করছে, কিংবা এর মারণক্ষমতা কতটা তীব্র, এখনও জিনোম সিকোয়েন্স না করায় তা জানা নেই। বিশেষজ্ঞ মনে করছেন দেশের মধ্যেই জিনোম সিকোয়েন্স শুরু করা সময়ের দাবি। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ নেপাল, ভারত, পাকিস্তান এ নিয়ে কাজ শুরু করেছে বহু আগেই। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ নেপালের জনসংখ্যা প্রায় তিন কোটি। তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা আমাদের চেয়ে উন্নত না হলেও তারা এ নিয়ে গবেষণায় করেছে ও তাদের বিজ্ঞানীদের দিয়ে জিনোম সিকোয়েন্স করা সম্ভব হয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশগুলোসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ করোনাভাইরাসের প্রকৃতি এবং আচরণ আরও ভালোভাবে জানতে এর জিনোম সিকোয়েন্সিং করছে। তবে বাংলাদেশ এখনও জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের কাজ শুরু করেনি। দেশের বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের জিনোম সিকোয়েন্সিং সক্ষমতা রয়েছে। জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের জন্য একটি জাতীয় কমিটি গঠন করে বিদ্যমান কাঠামো আছে ও সংস্থান আছে এবং সেগুলো আমাদের ব্যবহার করতে হবে।

জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের মাধ্যমে কোনো জীবের জিনগত যে তথ্যগুলো ডিএনএ বা আরএনএ’র মধ্যে থাকে, সেগুলো সম্বন্ধে অবগত হওয়া যায়।  গঠন অনুযায়ী ভাইরাসকে পূর্ণাঙ্গ জীব হিসেবে বিবেচনা করা যায় না, বরং এটির অবস্থান জীব ও জড়ের মাঝামাঝি। তাই টিকে থাকার জন্য এটির প্রয়োজন কোনো হোস্টের। ডিএনএ কিংবা আরএনএ’তে ভাইরাস নিজের জিনগত তথ্য বহন করে। প্রতিবেশী দেশ ভারত, পাকিস্তান এবং নেপালের পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশ রোগীর নমুনা থেকে ভাইরাসটির জিনোম সিকোয়েন্স করছে। নিউইয়র্কের বিজ্ঞানীরা ভাইরাসটির সিকোয়েন্সিং থেকে এই সিদ্ধান্ত উপনীত হয়েছেন যে শহরে যে সেরোটাইপ করোনাভাইরাস সবচেয়ে বেশি তা ইউরোপ থেকে এসেছে।

সব জায়গায় মানুষ একই হারে আক্রান্ত হচ্ছে না। ভাইরাস ভিন্ন ভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের বৈশিষ্ট্য নিয়ে অবস্থান করছে।  এর অন্যতম কারণ ভাইরাসের জিনের পরিবর্তন। জিনোম সিকোয়েন্স করা হলে জানা যেত ভাইরাসটি কত দ্রুত এর রূপ পাল্টাচ্ছে এবং ভাইরাসটি কোন স্থান থেকে আমাদের দেশে এসেছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো কোনো দেশে ভ্যাকসিন আবিষ্কৃত হলে সেটি আমাদের দেশে কার্যকর করা কষ্টসাধ্য হতে পারে মিউটেশনের ফলে ভিন্ন স্ট্রেইনের ভাইরাস বিরাজ করায়।  তাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব জিনোম সিকোয়েন্স করা প্রয়োজন। জিনোম সিকোয়েন্স করতে কয়েক সপ্তাহ থেকে মাস খানেকের বেশি সময় লাগতে পারে।  এজন্য আগেভাগেই জিনোম সিকোয়েন্স করে প্রস্তুতি নিয়ে রাখা দরকার। তা না হলে যথাসময়ে চিকিৎসার অভাবে প্রাণহানি বাড়তে পারে।

বাংলাদেশে ইতালি, চীন ও যুক্তরাজ্য থেকে সবচেয়ে বেশি করোনা-আক্রান্ত রোগী এসেছে। তাই বাংলাদেশে বিরাজমান ভাইরাসের সঙ্গে ওই দেশগুলোর ভাইরাসের সামঞ্জস্য থাকতে পারে। কিন্তু জিনোম সিকোয়েন্সিং ছাড়া কতটুকু সামঞ্জস্য রয়েছে, তা জানা সম্ভব নয়।  ওই দেশগুলোরও সব স্থানে জেনেটিক পরিবর্তনের জন্য ভাইরাসের সংক্রমণ একই হারে হয়নি। জিনোম হলো কোনো জীবের সম্পূর্ণ জিনগত উপাদান। জিনোম সিকোয়েন্সিং হচ্ছে জিনোমিক প্রেডিকশন নামে পরিচিত একটি প্রক্রিয়ায় রোগ সনাক্ত করার শক্তিশালী মাধ্যম। বিশেষজ্ঞরা জানান, ভাইরাসের যখন সংক্রমণ হয় তখন তার জিনগত পরিবর্তন শসনাক্ত করতে সহায়তা করে জিনোম সিকোয়েন্সিং। এই সিকোয়েন্সিং বিজ্ঞানীদের ভাইরাসটির বিভিন্ন বিষয় বুঝতে সাহায্য করে। ভাইরাসটি কত দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে এবং কিভাবে এর ভ্যাকসিন তৈরি করা যেতে পারে সেটিও এর মাধ্যমে বোঝা যায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ও বায়োটেকনোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোস্তাক ইবনে আইয়ুব জানান, আমাদের দেশে ভাইরাসটি কত দিন থাকবে তা আমরা জানি না। আমরা জানি ভাইরাসটি ভিন্ন ভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন আচরণ করছে। এর প্রকৃতি বোঝার জন্য আমাদের জিনোম সিকোয়েন্সিং দরকার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এবং বায়োটেকনোলজির অধ্যাপক শরীফ আক্তারুজ্জামান জানান, এখন পর্যন্ত তিনটি সেরোটাইপ করোনাভাইরাস পাওয়া গেছে। এগুলো হচ্ছে- এ, বি এবং সি। তিনি বলেন, ‘ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রচুর সংখ্যক এ ও সি সেরোটাইপের করোনাভাইরাস পাওয়া গেছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোতে সবচেয়ে বেশি আছে বি সেরোটাইপ করোনাভাইরাস।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবুল কালাম আজাদ জানান, আমরা জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের কথা ভাবছি। তবে এখন আমাদের অগ্রাধিকার আরও বেশি করোনা পরীক্ষা করা এবং এর বিস্তার ও মৃত্যু কমানো। যেহেতু এই ভাইরাস খুব শিগগির দূর হবে না। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসলে আমরা সিকোয়েন্সিং করব।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সূত্র থেকে জানা যায়, জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের এখনই কোনো পরিকল্পনা নেই তাদের। আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এএসএম আলমগীর জানালেন, বিশ্বব্যাপী, এখন পর্যন্ত প্রায় ১৩ হাজার জিনোম সিকোয়েন্স করা হয়েছে। তবে কোনো বড় পার্থক্য পাওয়া যায়নি। আমরা শিগগির এটি করবো। তবে কবে নাগাদ জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের কাজ শুরু করবেন তা তিনি বলতে পারেননি।

সবশেষে বলবো সরকার ও এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ যারা আছেন তারা এগিয়ে আসুন। জিনোম সিকোয়েন্সিং বিজ্ঞানীদের পরবর্তী সময়ের জন্য সঠিক কৌশল তৈরি করতে এবং প্রাদুর্ভাবের ভবিষ্যদ্বাণী করতে সহায়তা করে। এখন জাতীয় কমিটিতে গুরুত্ব দিয়ে রাখা না রাখা নিয়ে অভিমান নয়। জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের কাজ শুরু করুন এবং দেশের মানুষের এ দুঃসময়ে পাশে দাড়ান ও বাঁচাতে সহায়তা করুন।

লেখকঃ আইনজীবী, গবেষক ও প্রবন্ধকার 
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, ঢাকা।


canvasnews24/সা আ 

0/Post a Comment/Comments

অপেক্ষাকৃত নতুন পুরনো