ইমামুল ইসলামের ছোটগল্প ''বিষাক্ত ফণা'' ধারাবাহিক-২

ইমামুল ইসলামের ছোটগল্প ''বিষাক্ত ফণা'' ধারাবাহিক-২

ইমামুল ইসলামের ছোটগল্প ''বিষাক্ত ফণা'' ধারাবাহিক-২
নিজের মধ্যে বিষ ধারণ করে বহু মানুষ অবিরাম ছুটছে আর ছুটছে। কেউ সাময়িক প্রশান্তির জন্য বিষাক্ত দেহের উষ্ণতা খোঁজে। বিষাক্ত নগরের মানুষের নীলাভ দেহে লুকায়িত বিষ নগর জীবনের অলিগলিতে গোপনে গোপনে ভাইরাসের মতো ছড়াচ্ছে। এ সম্পর্কে কোনো ধারণাই ছিলোনা সমীকের। হাঁটা-চলার মাঝে এ বিষাক্ত ছোঁয়ায় সে কখনও আক্রান্ত হয়নি। ঢাকা মহানগরীতে বাড়তি মানুষের আধিক্যে রমরমা ব্যবসার পসরা গড়ে উঠেছে।এমন সময় সমীকের সাথে পরিচয় হয় আনান নামে ছাত্রের। বিশ্ববিদ্যালয়ে সবেমাত্র ভর্তি হয়েছে বিপণন প্রক্রিয়ায় খুবই পারদর্শী হতে। সমীকের চেয়ে আনান বছর দু'য়েকের ছোট। কিন্তু বাস্তবতাকে আত্মস্থ করা, নতুন পরিবেশে নিজেকে মানানসই করা এবং মহানগরীর অলিগলিতে নীরবে কি ঘটছে তার তাজা তথ্য ছিলো তার নখদর্পণে। নারীর প্রতি ছিল তার অসম্ভব আসক্তি। কোথায় কোথায় নারী বেচাকেনা হতো এবং কতোটা সহজলভ্য ছিল তার তরতাজা খবর নিয়ে আসতো আনান । রসালো ও হাস্যকর ঢঙে উপস্থাপন করতো কোথায় কে কেমন অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে তা নিয়ে। বিশেষ আকাঙ্ক্ষার তীব্রতা নাড়াচাড়া দিতো এবং কোন প্রক্রিয়ায় আনান তার আকাঙ্ক্ষার তীব্রতা লগু করবে তার উপায় খুঁজতো। জনসংখ্যার অধিক চাপে ছোট্ট এই ভূখণ্ডে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের অভাবে কিছু কিছু নিষিদ্ধ ব্যবসা রাষ্ট্রব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে। মাদক ব্যবসা ও পতিতাবৃত্তি তার মধ্যে অন্যতম। সমাজের কিছু কিছু রুইকাতলা প্রান্তিক মানুষের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে এ বিষাক্ত ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। কেমন করে, কীভাবে এ বিষাক্ত ব্যবসা চলছে তার গোপন রহস্য উন্মোচন করা ও স্বচক্ষে দেখার জন্য সমীক উদগ্রীব থাকে। তবে তার সাহসের নিম্নমুখিতার কারণে পরখ করে দেখা হয়নি। কোনো একদিন সমীকের রুমে চলে আসে আনান। সমীককে আনান তার পৌরুষিকতার অনিয়ন্ত্রিত আস্ফালনের কথা বলে। অনিয়ন্ত্রিত কামনার গতি নিয়ন্ত্রণ করার জন্য আনান একটি স্বল্পমেয়াদী পদ্ধতি গ্রহণে খুবই আগ্রহী। দুধ খেতে হবে বলে গাভী কিনতে হবে-এমন দীর্ঘমেয়াদী পন্থা অবলম্বনে সে খুবই উদাসীন। তাছাড়া ছাত্রজীবনে এ ধরনের অবাস্তব ও ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে খুবই ভীতু আনান। কিন্তু আনান দীর্ঘমেয়াদী পদ্ধতি গ্রহণের জন্য গ্রহণযোগ্য ও কাঙ্ক্ষিত রমনী খুঁজে অহরহ।আনান সমীকের কাছে তার নতুন ভুবনের আবিষ্কারের রমরমা ও তাজা তথ্য সহজাত ভঙ্গিতে তুলে ধরে। অচিরেই সে আবার ব্যগ্র বিষাক্ত নেশার বুদবুদ গলিতে প্রবেশ করবে। আর সেখানে সমীককে আনানের একান্ত এসকর্ট হিসেবে বাছাই করে। আনান বলে, "চলেন ভাই, নতুন ভুবনে গিয়ে অনিয়ন্ত্রিত কামনার আস্ফালনের গতি কিছুটা লঘু করে আসি।" সমীক তার সহজাত আকাঙ্ক্ষায় বিষাক্ত বিষক্রিয়া হোক সেটা সে মোটেও চায়না। তবে ওই বিষাক্ত নগরের বুদবুদগুলো স্বচক্ষে দেখার আগ্রহ ব্যক্ত করে।কোনো এক ছুটির দিনে আনান আর সমীক বিশেষ ভুবনে হানা দিবে। আনান তার অনিয়ন্ত্রিত ক্ষুধা নিবারণ করবে আর সমীক গোপন জগতের লীলা স্বচক্ষে অবলোকন করবে। কোনো এক শুক্রবারে সকাল সাড়ে দশটার সময় আনান রুমের করা নাড়ল। সমীককে শার্ট-প্যান্ট পরিধান করে বের হতে বলল। দু'জন মিলে হল গেটে গিয়ে রিকশা ভাড়া করে। সমীকের ভিতরে একধরনের অজানা কৌতূহল ও কিছুটা ভীতি কাজ করছে। আর আনানের ভিতরে অনিয়ন্ত্রিত কামনার গতি সজোরে বয়ে চলছে। তাই সে রিকশাওয়ালাকে প্যাডেলে সর্বশক্তি বিনিয়োগ করতে বলে এবং বিনিময়ে সে ভাড়ার চেয়ে কিছু বেশি বকশিসের আশ্বাসও দেয়। রিকশা গিয়ে টিকাটুলির প্রধান সড়কের পাঁচ কিংবা ছ'তলা একটি বাড়ির সামনে থামল। যথারীতি শর্ত মোতাবেক বকশিসসহ ভাড়া মিটিয়ে বাড়ির গেটে দারোয়ানের কাছে এসে আনান সমীকের সাথে পরিচয় করিয়ে তাকে। আনান বলে,'ভাই উনি হচ্ছেন ভান্ডারি ভাই।' ভান্ডারি ভাই দেখতে সাদামাটা ও চুলগুলি পেছন থেকে বাউলের মত। আনান ভান্ডারি ভাই'র কাছে উপরে কেমন কালেকশন আছে তা জানতে চায়। ভান্ডারি ভাই ইতিবাচক ইঙ্গিত দিলে আনান ও সমীক সিঁড়ি দিয়ে সরাসরি চারতলায় উঠে যায়। চারতলায় উঠে সমীক দেখলো যে সে আসলেই এক নতুন ভুবনে প্রবেশের করছে। এ ধরনের দৃশ্য সে জীবনে এই প্রথম অবলোকন করছে। সমীকের মধ্যে অনেকটা ভীতি কাজ করছে দেখে, আনান আশ্বাস দিয়ে বলে, 'ভাই, এখানে ভয়ের কিছু নেই, পুলিশ ও স্থানীয় নেতারা এখান থেকে মাসোয়ারা পায়। আপনি নিশ্চিন্তে থাকতে পারেন।' সমীক দেখলো, এখানে নারী বিক্রির বাজার বসেছে। প্রায় বিশ থেকে পঁচিশ জন নারী অর্ধবসনে ড্রয়িংরুমে বসে আছে। তারা কেউ কেউ নিজেদের মধ্যে খোশগল্প করছে আবার কেউ কেউ চুপচাপ বসে আছে। বিভিন্ন বয়সের ক্রেতা তার পছন্দমত নারী এখান থেকে ক্রয় করে বিল্ডিংয়ের বিভিন্ন কক্ষে নিয়ে যাচ্ছে। সমীকের মধ্যে নতুন ভুবন আবিষ্কারের চেয়ে ভীতিই বেশি কাজ করছে। আনান তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি কালেকশন রাখা প্রতিটি পণ্যের উপরে নিক্ষেপ করে। এরপর সমীকের কাছে জানতে চায় কোন পণ্যটি তার অনিয়ন্ত্রিত ক্ষুধা নিবারণ করতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। সমীকের দৃষ্টি যায় উনিশ-বিশ বছরের একটি উর্বশী মেয়ের দিকে। শাড়ি পরিহিতা মেয়েটি কোনো এক কোনে চুপচাপ বসে আছে। সুন্দর শ্যামল বর্ণের মেয়েটি অন্যান্য মেয়েদের থেকে অনেকটাই লম্বা। চেহারার হতাশার ছাপটা স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। তবে দেবদারূর মতো শক্ত ও চেহারায় কোমলতার আভাও বিদ্যমান।শরীরের মেদ নেই, হ্যালিবেরির মত ফিগার। পরনে শাড়িটি মাঝামাঝি দামের। ব্লাউজটি শরীরের সাথে একেবারেই মানিয়েছে। হাতদু'টি কাঁধ থেকে এক মোহনীয় সতেজতা নিয়ে নেমে এসেছে। এ যেন এক মায়াবতী মানবী।নিস্প্রভ চোখদুটির মাঝে কোমলতা ও হতাশার মাঝামাঝি ছাপ দেখা যাচ্ছে। আনানকে উক্ত মেয়েটি দেখতে কেমন জানতে চায় সমীক। আনান আর ধৈর্য ধরে তার গতির নিয়ন্ত্রণ নিজের আয়ত্তে রাখতে পারছেনা। এতগুলো অল্পবসনা নারীর মাঝে নিজের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা বড় কঠিনই বটে। বাছাই প্রক্রিয়া সংক্ষিপ্ত করে সমীকের পছন্দে মত দিয়ে উক্ত মেয়েটিকে নিয়ে ক্ষণিকের প্রশান্তি মিটাইতে চাইল আনান। সমীক তাকে অনুরোধ করলো মেয়েটি ভিতরের বেদনার ইতিহাসটি জানতে।

আনান মেয়েটিকে নিয়ে অনিয়ন্ত্রিত কামনার গতির লঘুকরণের জন্য কোনো এক কক্ষে নিয়ে গেল। আনান তার অনিয়ন্ত্রিত ক্ষুধা একবার মিটিয়ে মিনিট দশেকের মধ্যে ফিরে এলো। আবার সে নতুন পণ্য বাছাই-প্রক্রিয়ায় মনোনিবেশ করে। আর সমীককে বলতে থাকে উক্ত মেয়েটির সাথে তার একান্ত সান্নিধ্যের কথা। আনান বলে, 'মেয়েটি কক্ষে ঢুকে ছিটকানি লাগিয়ে দিয়ে নিজের শরীরের শাড়ি ও ব্লাউজ খুলে ফেলে। এরপর আমাকে প্যান্ট-শার্ট খুলে কাছে আসতে ইশারায় আহ্বান জানায়।' সমীক আনানকে জিজ্ঞেস করে, 'তোমাদের দুই জনের মধ্যে কোনো কথোপকথ হয়নি।' আনান প্রতিত্তোরে বলে, 'কোনো কিছু জিজ্ঞেস করলেই মেয়েটি বলে, যেই কাজ করতে এসেছেন সেই কাজ করে চলে যান। বাড়তি প্যাঁচাল পিটে কি লাভ। তাড়াতাড়ি সবকিছু খুলে আসেন, কাজ করে চলে যান।' সমীক এর পরের প্রক্রিয়া কী জানতে চাইলে আনান জানাল,' আমি পরিধেয় সমস্ত পোশাক খুলে মেয়েটির কাছে গেলে, মেয়েটি রূঢ় কণ্ঠে আমাকে বলে, আপনার সাপটি যে এত লম্বা ও স্বাস্থ্যবান তা আগে কেন আমাকে বলেননি? মেয়েটি আবারও আমাকে বলল, আমি যদি আগে জানতাম আপনার সাপের ফণা এত বিষাক্ত এবং আমার পরিধেয় বসনের বিচ্যুতি না ঘটাতাম, তাহলে আমি আপনার সাথে উক্ত কাজে লিপ্ত হতাম না। আপনার বিষাক্ত সাপের ফণার ছোবলে আমার শরীরে যে বিষক্রিয়া হবে তা আমার জন্য বড়োই অসহনীয় ও কষ্টকর হবে।' সমীক আনানকে বলে, 'লজ্জা হচ্ছে মেয়েদের সহজাত গূণ। নিষিদ্ধ জগতের মেয়েটিও তার লজ্জা বিকিয়ে দিতে চায়না। তার সূতাবিহীন শরীর তুমি অবলোকন করেছো বলেই তুমি তার থেকে দু'দন্ড শান্তি নিতে পেরেছো। তোমার নিরাবরণ শরীর যদি মেয়েটি আগে দেখতো এবং তোমার সাপের ফণাটির দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ পরিমাপ করতে পারতো, তাহলে মেয়েটি তোমার সাথে উক্ত কর্মে লিপ্ত হতোনা। মেয়ে মানুষ এমনই যে, তাদের লজ্জা সবসময় রক্ষা করায় সচেষ্ট থাকে। সমাজব্যবস্থার কিছু কিছু অনিয়ম ও নিষ্ঠুরতা নারীর লজ্জাকে পণ্য বানিয়ে পুরুষতন্ত্রের বিষাক্ত ফণা দ্বারা সেটাকে দংশন করে। উক্ত দংশনের বিষক্রিয়ায় নারী নীলকণ্ঠী হয়ে উঠে।' আনান নতুন করে আবার তার অনিয়ন্ত্রিত ক্ষুধা নিবারণে আর একটি মেয়ে নিয়ে কোনো এক কক্ষে যায়। এমন সময় সমীক পূর্বের মেয়েটির সাথে কথা বলার জন্য কাছে ডাকে। মেয়েটি সমীককে একজন ক্রেতা ভেবে তার ইশারায় ইতিবাচক সাড়া দেয়। মেয়েটি কাছে আসলে সমীক জিজ্ঞেস তাকে করে, 'কেনো তুমি এই বিষাক্ত জগতের বাসিন্দা? তুমিতো দেখতে শুনতে খারাপ না। বিয়ে করে স্বামীর সাথে স্বাভাবিক সংসার করতে পারো।' মেয়েটি তার চোখের সহজাত চাহনি দিয়ে সমীককে যে উত্তর দিল তা কখনো তার মানসপট থেকে হারিয়ে যাওয়ার নয়। মেয়েটি সমীককে বলে, 'আরে বাবু, নীতির কথা, নিয়মের কথা, আপনারা সবাই আওরাতে পারেন বাস্তবতার ঊর্ধ্বে উঠে। বিষাক্ত ফণার ছোবল খেয়েছেন কখনো?' সমীক উৎসুক দৃষ্টিতে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে থাকে। মেয়েটি আবার তার কথার পুনরাবৃত্তি করে, 'আপনি কি জানেন বিষাক্ত ফণার ছোবল খাওয়া বা বিষ খাওয়া সহজ কিন্তু বিষ হজম করা কিংবা শরীর থেকে বের করা বড়োই কঠিন?' মেয়েটি কথাগুলো বলে দ্রুত চলে গেল তার পূর্বের বসার স্থানে। সমীকের মস্তিষ্কে মেয়েটির কথাগুলো বিষাক্ত ফণার মতো দংশন করে এবং বিষক্রিয়া শুরু করে দেয়। তার মস্তিষ্কের নিউরনগুলো দ্রুত বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হতে থাকে।

canvasnews24/সা আ

0/Post a Comment/Comments

অপেক্ষাকৃত নতুন পুরনো