তিন দেশের জাতীয় সংগীত রচনার মতভেদ ও মতামত।canvasnews24.com

তিন দেশের জাতীয় সংগীত রচনার মতভেদ ও মতামত।canvasnews24.com

রায় অঞ্জন  
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলাদেশ ,ভারত ও শ্রীলঙ্কার জাতীয় সংগীতের রচয়িতা-- এ নিয়ে নানারকম মতভেদ আছে আবার অকাট্য স্বীকৃতিও আছে। যেহেতু রবিঠাকুরের সকল সৃষ্টিই এখন গবেষণার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে, সেই অর্থে এই একটা বিষয় নিয়েও গবেষনার দাবী যেমন রাখে, গবেষণা হয়েছেও প্রচুর। গবেষণা কখনো থেমে থাকে না, চলে যুগের পর যুগ, বেরিয়ে আসে নতুন নতুন তথ্য, তত্ত্ব। রবীন্দ্রনাথকে আশ্রয় করে বেঁচে থাকা একজন আমিও। আমারো কিছু পর্যবেক্ষণ আছে এই ব্যাপারে।

আমার মতে, কবি কোনো দেশের জাতীয় সংগীত হবে ভেবে কবিতা বা গান রচনা করেননি। বরং দেশগুলি কবির সৃষ্টি থেকে গান বেছে নিয়ে যার যার জাতীয় সংগীত হিসেবে গ্রহন করেছে। অন্যভাবে বললে বলা যায়- বাংলাদেশ, ভারত এবং শ্রীলংকা, কোনো দেশেরই রাষ্ট্রীয় সংস্থা কবির কাছ থেকে তাঁদের দেশের জাতীয় সংগীত লিখে দেয়ার জন্য অনুনয় করেননি। এই তিন দেশেরই জাতীয় সংগীত বাছাই করা হয়েছে কবির প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ সৃষ্টি থেকে। বাংলাদেশ এবং ভারতের জাতীয় সংগীত কবির শতভাগ প্রত্যক্ষ অন্যদিকে শ্রীলংকার জাতীয় সংগীতে কবির আংশিক প্রত্যক্ষ, আংশিক পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতা ছিল বলে ইতিহাস স্বাক্ষ্য দেয়।
বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত-

১৯০৫ সাল, দেশ জুড়ে যখন বংগভংগ আন্দোলন তুংগে। কবি তখন বিস্ময়কর ভাবে চুপ করে ছিলেন। প্রথম সরব হয়েই তিনি গিরিডিতে অবস্থানকালে এক মাসে কুড়িখানা স্বদেশী গান রচনা করে ফেলেন। ঠিক সেই সময়কালেই অর্থাৎ১৯০৫ সালে বাউল শিল্পী গগন হরকরার সুরের অনুকরণে লিখে ফেলেন এক অনন্য বাউল তথা দেশাত্মবোধক গান। ২০ লাইনের গানটির প্রথম ১০ লাইন ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ তারিখে ঢাকার পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত জনসভা শেষে ঘোষিত স্বাধীনতার ইশতেহারে এই গানকে জাতীয় সঙ্গীত হিসাবে ঘোষণা করা হয়। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে স্বাধীন বাংলাদেশের সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে এই গান প্রথম জাতীয় সঙ্গীত হিসাবে গাওয়া হয়।
“আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।
চিরদিন তোমার আকাশ, তোমার বাতাস, আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি॥“
এতে প্রতীয়মান হয় যে, কবি বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতের জন্য গানটি রচনা করেননি কিন্তু বাংলাদেশ সরকার কবির সৃষ্টিসমূহ থেকে একটি সৃষ্টিকে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে নির্বাচন করেন। এতদ্বিষয়ে সন্দেহাতীত ভাবে বলা যায়, বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতের রচয়িতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

ভারতের জাতীয় সংগীত-
জনগণমন-অধিনায়ক জয় হে ভারতভাগ্যবিধাতা!
পঞ্জাব সিন্ধু গুজরাট মরাঠা দ্রাবিড় উৎকল বঙ্গ
এর রচনাকাল জানা না গেলেও ১৯১১ সালে জাতীয় কংগ্রেসের একটি সভায় এটি প্রথম গাওয়া হয়। ১৯৫০ সালে স্বাধীন ভারতের জাতীয় সংগীতরূপে স্বীকৃতি লাভ করে এর প্রথম স্তবকটি। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত ‘বন্দেমাতরম’ গানটিও সমমর্যাদায় জাতীয় সংগীতের স্বীকৃতি লাভ করে।
পরবর্তীকালে ‘গায়নযোগ্যতা’ বা ‘singability’-এর কারণে ‘বন্দেমাতরম’-এর বদলে ‘জনগণমন’ কেই ভারতের জাতীয় সংগীত করার পক্ষে বিশেষজ্ঞরা মতপ্রকাশ করেন। একই সাথে ভারতের মুসলমান সমাজের কাছেও এই গানটির গ্রহণযোগ্যতা ছিল। বন্দেমাতরম-এ দেশকে হিন্দু দেবীর আদলে বন্দনা করায় সেই গানটি তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। অবশেষে ২৪ জানুয়ারি ১৯৫০ তারিখে ভারতের সংবিধান সভা এই গানটিকে জাতীয় সংগীত বা ন্যাশনাল অ্যানথেম হিসাবে গ্রহণ করেন। সভাপতি ডক্টর রাজেন্দ্র প্রসাদ বলেন, “জনগণমন নামে পরিচিত গানটি কথা ও সুরসহ ভারতের জাতীয় সংগীতরূপে সরকারিভাবে গীত হবে। দীনেন্দ্রনাথ ঠাকুর এর স্বরলিপিতে এই গানটি সমগ্র ভারতবাসীকে উদ্বিলিত করে। এই গানটিরও রচয়িতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
শ্রীলংকার জাতীয় সংগীত-

শ্রীলংকার জাতীয় সংগীতের রচনা নিয়ে কিঞ্চিৎ মতভেদ দেখা যায় গবেষণায় কিংবা ইতিহাসে। যেখানে বাংলাদেশ এবং ভারতের জাতীয় সংগীত রচয়িতা নিয়ে কোন তর্ক নাই, তবে শ্রীলংকার জাতীয় সংগীতের রচয়িতার নামে খানিক মতভেদ আছে বলেই আমি লেখার শুরুতে “প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ” শব্দ যুগল ব্যাবহার করেছি। শ্রী’লঙ্কা মাতা ‘গানের রচয়িতা সম্পর্কে বিভিন্ন মত আছে। সবচেয়ে প্রচলিত ধারণা হচ্ছে শ্রীলঙ্কার খ্যাতিমান সংগীত ব্যক্তিত্ব আনন্দ সামারাকুন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দ্বারা অনুপ্রাণিত ও উৎসাহিত হয়ে গানটি লিখেছেন। অনেকে মনে করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পুরো গানটি লিখেছেন। কেউ কেউ বলেছেন যে রবীন্দ্রনাথ গানটির সুরকার এবং আনন্দ সামারাকুন রচয়িতা। আনন্দ মারাকুন বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে রবীন্দ্রনাথের ছাত্র ছিলেন। বিশ্ব ভারতীতে ৭ মাস অধ্যায়ন করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের ঘনিষ্ঠতা পেয়েছেন নিবিড়ভাবে, বলাচলে সেসময়ে তাঁদের মধ্যে গুরু-শিষ্য ভাব ছিল।

১৯৪৮ সালে স্বাধীনতার পরও শ্রীলঙ্কায় ব্রিটেনের জাতীয় সংগীত ব্যবহার করা হত। ১৯৫০ সালে শ্রীলঙ্কার অর্থমন্ত্রী জে.আর জয়বর্ধনে শ্রীলঙ্কা সরকারকে আনন্দ সামারাকুনের অনুবাদকৃত -'নমো নমো মাতা, সু্ন্দর শ্রীবরণী ' গানটিকে শ্রীলঙ্কার জাতীয় সংগীত করার আবেদন জানান। তখন শ্রীলঙ্কা সরকার গৃহ ও গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রী এডুইন বিজয়রত্নের নেতৃত্বে জাতীয় সংগীত প্রনয়ণ সংক্রান্ত কমিটি আনন্দ সামারাকুনের নমো নমো মাতা জাতীয় সংগীত হিসেবে গ্রহণ করে, ২২ নভেম্বর ১৯৫১ সালে সরকার গানটিকে শ্রীলঙ্কার জাতীয় সংগীত রূপে ঘোষণা করে। ১৯৫২ সালে শ্রীলঙ্কার প্রথম স্বাধীনতা দিবসে গানটি আনুষ্ঠানিকভাবে গাওয়া হয়।

১৯৫০-এর দশকের শেষের দিকে গানটির প্রথম লাইন নমো নমো মাতা নিয়ে অনেক বিতর্ক শুরু হয়। এটিকে দেশের জন্য অপয়া হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল এবং দেশের দুই প্রধানমন্ত্রীর মৃত্যুর ঘটনায় দায়ী করা হয়েছিল। তাই শ্রীলঙ্কা সরকার ১৯৬১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আনন্দ সামারাকুনের অমতে ও প্রবল বিরোধিতা সত্ত্বেও গানটির প্রথম লাইনে পরিবর্তন আনে এবং প্রথম লাইনটি বদলে শ্রীলঙ্কা মাতা, আপা শ্রীলঙ্কা নমো নমো নমো নমো মাতা করা হয়। আনন্দ সামারাকুন ১৯৬২ সালের এপ্রিলে মাসে আত্মহত্যা করেন ও তার আত্মহত্যার কারণ হিসেবে তার রচিত জাতীয় সঙ্গীতের ক্ষতিসাধনকে দায়ী করেন।

পরিশেষে বলা চলে রবীন্দ্রনাথই একমাত্র ব্যক্তিত্ব, যাকে বাংলাদেশ, ভারত এবং শ্রীলংকার জাতীয় সংগীতের রচয়িতা বলা যায় তবে ‘প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ” শব্দযুগলকে সাথী করে রাখলে ইতিহাস সমুজ্জ্বল থাকবে বলে আমার ধারণা।

পুনশ্চঃ এই তিনটি দেশের মধ্যে তুলনা করলে অন্তত একটি বিষয়ে বাংলাদেশ গর্ববোধ করতে পারে, তা হচ্ছে, বাংলাদেশে সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশু দেশ হিসাবেই তার নিজস্ব জাতীয় সংগীত পেয়েছে, অন্যদিকে ভারত পেয়েছে (১৯৪৭ সালের ১৫ অগাস্ট -১৯৫০ সালের ২৪ শে জানুয়ারি) প্রায় আড়াই বছর পর, আর শ্রীলঙ্কা পেয়েছে ( ১৯৪৮ সাল- ১৯৬২ সাল) প্রায় চৌদ্দ বছর পরে। এই আড়াই বছর এবং চৌদ্দ বছরে দেশগুলির রাষ্ট্রীয় এবং আন্তর্জাতিক কার্যক্রমগুলি কিভাবে পরিচালিত হতো, তা নিয়ে আমার জ্ঞাত অর্জনকে অন্য কোন একসময় লিখব।


canvasnews24/সা আ 

0/Post a Comment/Comments

অপেক্ষাকৃত নতুন পুরনো